নিজস্ব প্রতিবেদক
খাগড়াছড়ি: পাহাড়ের অর্থনীতিতে পর্যটনের নতুন দিগন্ত ও আগামীর পথরেখা
মো. সাহিদুল ইসলাম সুমন
পাহাড়ের বুক চিরে যখন ভোরের কুয়াশা সরে যায়, তখন খাগড়াছড়ির আলুটিলা কিংবা সাজেকের যে রূপ আমাদের চোখে পড়ে, তাকে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বললে ভুল হবে। এটা আসলে একটা বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা গত কয়েক দশক ধরে আমাদের নীতিনির্ধারকদের চোখের সামনে থেকেও যেন আড়ালে রয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পর্যটন শিল্পের জন্য কতটা উপযুক্ত, তা নিয়ে নতুন করে তর্ক করার অবকাশ নেই। বরং আমাদের এখন ভাবা দরকার, এই পাহাড়ী জনপদকে কীভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাবে রূপান্তর করা যায়। পর্যটন কেবল কিছু মানুষের ঘুরে বেড়ানো নয়, অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করে। যখন একজন পর্যটক খাগড়াছড়িতে পা রাখেন, তিনি কেবল একটি হোটেল ভাড়া নেন না, বরং তিনি স্থানীয় পরিবহন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হস্তশিল্প, স্থানীয় কৃষি পণ্য এবং গাইড পরিষেবার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এই যে অর্থের প্রবাহ, তা সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে বা জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান এখন প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি, যা ২০৩০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে রাষ্ট্রের। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাগড়াছড়ি হতে পারে তুরুপের তাস। কিন্তু মুশকিল হলো, আমাদের পরিকল্পনাগুলো এখনো সেই সনাতন আমলেই আটকে আছে। আমরা কেবল কিছু রাস্তাঘাট আর কয়েকটা রিসোর্ট বানিয়েই মনে করছি পর্যটনের উন্নয়ন হয়ে গেছে। আসলে খাগড়াছড়ির মতো একটি স্পর্শকাতর এবং বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সুসংহত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
খাগড়াছড়ির পর্যটনকে যদি আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় এর প্রধান শক্তি হলো বৈচিত্র্য। আলুটিলার প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ, রিচাং ঝরনা কিংবা দীঘিনালার হাজাছড়া ঝরনা—প্রতিটি স্থানেরই নিজস্ব একটি আবেদন আছে। তবে সাজেক ভ্যালি বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলার পর্যটনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সাজেক রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত, এর প্রবেশপথ এবং যাবতীয় লজিস্টিক সাপোর্ট আসে খাগড়াছড়ি শহর থেকে। এর ফলে খাগড়াছড়ি একটি বিশাল ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই ট্রানজিটকে আমরা কতটা অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। দেখা যায়, পর্যটকরা খাগড়াছড়ি হয়ে সরাসরি সাজেকে চলে যাচ্ছেন, ফলে মূল খাগড়াছড়ি শহরের ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যেখানে পর্যটকরা খাগড়াছড়ি শহরে অন্তত এক রাত অবস্থান করেন। এর জন্য খাগড়াছড়ি শহরের আশেপাশে নতুন নতুন বিনোদন কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। স্থানীয় সংস্কৃতির যে বিপুল বৈচিত্র্য এখানে রয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ বা সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটকরা কেবল পাহাড় দেখতে আসে না, তারা সেই পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা, খাবার এবং ঐতিহ্যকে জানতে চায়। পাহাড়ি খাবারের যে এক স্বতন্ত্র স্বাদ ও আবেদন রয়েছে, তাকে যদি হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা যায়, তবে এটি একটি আলাদা আয়ের উৎস হতে পারে।
অর্থনৈতিকভাবে পর্যটনকে টেকসই করতে হলে আমাদের ‘লিকেজ ইফেক্ট’ বা আয়ের চুঁইয়ে পড়া বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, বড় বড় রিসোর্টগুলো বাইরের বিনিয়োগকারীরা এসে গড়ে তুলছেন, ফলে লাভের বড় অংশটাই জেলার বাইরে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করাটা এখন সময়ের দাবি। পর্যটন শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য খাগড়াছড়িতে একটি বিশেষায়িত ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটন একটি সেবা খাত। এখানে কর্মীর ব্যবহার এবং পেশাদারিত্বই মূল সম্পদ। খাগড়াছড়ির শিক্ষিত বেকার যুবকদের যদি ট্যুর গাইড, শেফ কিংবা হোটেল ম্যানেজমেন্টে দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তাদের মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শ্রম দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। বরং এই পাহাড়েই তারা সম্মানজনক জীবিকা খুঁজে পাবে। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হলে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা ভাঙতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে মাঝেমধ্যেই যে অস্থিরতা দেখা দেয়, তা পর্যটন খাতের জন্য বড় অন্তরায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, যেখানে পর্যটন বিকশিত হয়েছে, সেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে এবং সংঘাত কমেছে। পর্যটনকে শান্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল আমাদের নিতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য খাগড়াছড়িতে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করা এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের পাহাড়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পার হতে হয়, তা অনেককেই নিরুৎসাহিত করে। এই প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল এবং আরও গতিশীল করা জরুরি।
অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বললে কেবল পিচঢালা পথ বুঝলে চলবে না। আমাদের দরকার ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ বা পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলোতে কংক্রিটের জঙ্গল না বানিয়ে বাঁশ, কাঠ এবং ছন দিয়ে তৈরি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কটেজ নির্মাণ করা উচিত। পর্যটকরা প্রকৃতি খুঁজতেই পাহাড়ে আসেন, তারা শহরের মতো বড় বড় দালান দেখতে চান না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করে যে উন্নয়ন হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে। পাহাড় কাটা বা প্রাকৃতিক ঝরনার উৎস মুখ বন্ধ করে রিসোর্ট তৈরি করা খাগড়াছড়ির পর্যটনের জন্য আত্মঘাতী হবে। বরং আমাদের উচিত ‘রেসপন্সিবল ট্যুরিজম’ বা দায়িত্বশীল পর্যটনের ধারণা জনপ্রিয় করা। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি বা কোড অব কনডাক্ট থাকা উচিত যাতে তারা যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে পাহাড়ের সৌন্দর্য নষ্ট না করে। একই সাথে পাহাড়ের পানির সংকট মেটাতে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি রিসোর্টগুলোতে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। খাগড়াছড়ির পর্যটনকে আমরা কেবল শীতকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। বর্ষাকালে পাহাড়ের যে অপরূপ রূপ এবং মেঘের খেলা দেখা যায়, তাকে কেন্দ্র করে ‘মনসুন ট্যুরিজম’ বা বর্ষাকালীন পর্যটনের প্রচার বাড়ানো যেতে পারে। এর ফলে সারা বছরই জেলায় পর্যটকদের আনাগোনা থাকবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পার্বত্য পর্যটনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা প্রযুক্তির সহায়তায় পর্যটনকে কতটা সহজ করে তুলেছে। খাগড়াছড়ির প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে হাই-স্পিড ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকরা তাদের অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে পারবেন, যা বিনা খরচে বিশ্বজুড়ে খাগড়াছড়ির ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাজ করবে। একটি সমন্বিত মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে যেখানে খাগড়াছড়ির সব হোটেল, রিসোর্ট, গাইড এবং জরুরি সেবার তথ্য থাকবে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে খাগড়াছড়িকে ‘সবুজ স্বর্গ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেল এখানে চমৎকার কাজ করতে পারে। সরকার যদি ভূমি এবং প্রাথমিক অবকাঠামো সরবরাহ করে এবং বেসরকারি খাত যদি সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে, তবে পর্যটনের চেহারা দ্রুত বদলে যাবে। তবে সব কিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। যদি স্থানীয় মানুষ মনে করে পর্যটন তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, তবে তারাই হবে পর্যটনের সবচেয়ে বড় রক্ষক।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর খাগড়াছড়িতে যে পরিমাণ পর্যটক আসে, তার থাকার জায়গা এবং খাবারের মান এখনো অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের। বিশেষ করে বাজেট পর্যটকদের জন্য মানসম্মত হোস্টেল বা থাকার জায়গার অভাব রয়েছে। খাগড়াছড়ি বাজার থেকে শুরু করে দীঘিনালা পর্যন্ত যে বিস্তৃত পথ, সেখানে মানসম্মত টয়লেট এবং রিফ্রেশমেন্ট পয়েন্ট তৈরি করাটা জরুরি। পর্যটন মানে কেবল গন্তব্য নয়, বরং পুরো যাত্রাটাই হতে হবে আরামদায়ক। বিদেশি পর্যটকদের জন্য আমরা খাগড়াছড়িতে ‘এথনিক ভিলেজ’ বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর গ্রাম ভিত্তিক ট্যুরিজম প্যাকেজ চালু করতে পারি। তারা সেখানে থেকে পাহাড়ী জীবন কাছ থেকে দেখবে, তাদের চাষাবাদ শিখবে এবং তাদের উৎসবে শামিল হবে। এটি কেবল পর্যটন নয়, বরং একটি বড় মাপের সাংস্কৃতিক বিনিময়। এর মাধ্যমে পাহাড়ী মানুষের শিল্প-সংস্কৃতি যেমন সংরক্ষিত হবে, তেমনি তাদের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয়।
পরিশেষে বলা যায়, খাগড়াছড়ির পর্যটন উন্নয়ন কেবল একটি জেলার উন্নয়ন নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটি বড় সুযোগ। আমাদের হাতে সম্পদ আছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি আর কার্যকর প্রয়োগের। খাগড়াছড়িকে আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবে তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনমির মতোই বিশাল অবদান রাখবে। পাহাড়ের এই নীরব বিপ্লব আমাদের সোনালী ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাক, এটাই কাম্য। পর্যটন শিল্পের এই অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের আর সময় নষ্ট করা চলবে না। এখনই সঠিক সময় খাগড়াছড়িকে বিশ্ব মানচিত্রে তার যোগ্য আসনে বসানোর।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com