ad728

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সম্প্রসারণ: কল্যাণরাষ্ট্রের পথে নতুন অধ্যায়


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ০৮ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সম্প্রসারণ: কল্যাণরাষ্ট্রের পথে নতুন অধ্যায় 
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
 
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একদিকে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, আয় বৈষম্য ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপ মোকাবিলা করছে; অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর নতুন বাস্তবতায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সরকার আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ। জাতীয় বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশেরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ইতিহাস দীর্ঘ হলেও এর কাঠামোগত সম্প্রসারণ শুরু হয় মূলত গত এক দশকে। বর্তমানে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিজিএফ, ভিজিডি, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীসহ শতাধিক কর্মসূচি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের কয়েক কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
তবে এবারের বাজেটকে আলাদা করে তুলেছে নতুন আটটি কর্মসূচি সংযোজন এবং বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর ব্যাপক সম্প্রসারণ।
সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। এ খাতে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে নারী প্রধান দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। স্বামীহারা, বিধবা, পরিত্যক্ত বা এককভাবে সংসার পরিচালনাকারী নারীরা সাধারণত অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাঁদের জন্য নিয়মিত নগদ সহায়তা সামাজিক নিরাপত্তার নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

একইভাবে কৃষক কার্ড কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও কৃষি উৎপাদনের বর্তমান ব্যয় বিবেচনায় এই সহায়তা খুব বড় নয়, তবে কৃষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো তৈরির সূচনা হিসেবে এর তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আজও কৃষকের ঘাম ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষকের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
নতুন কর্মসূচির মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য সম্মানী ভাতা চালুর সিদ্ধান্তও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে সংঘটিত বড় ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার উদ্যোগ সামাজিক দায়বদ্ধতারই অংশ।
ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ এবং খাদেমদের জন্য সম্মানী ভাতা চালুর সিদ্ধান্তও একটি নতুন সংযোজন। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পেশাজীবীরা অনিশ্চিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করে আসছেন। তাঁদের জন্য ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক।
একই সঙ্গে কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য অস্থায়ী ভাতা, ভিজিএফ কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানমুখী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা দর্শনের বিস্তৃত রূপকে তুলে ধরে।
তবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে কেবল বরাদ্দের পরিমাণের ওপর নয়; বরং সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ‘লিকেজ’ বা অপচয়। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্র ব্যক্তি অনেক সময় সুবিধা পান না, আবার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে অযোগ্য ব্যক্তিও তালিকাভুক্ত হয়ে যান। কোথাও একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির সুবিধা নিচ্ছেন, আবার কোথাও প্রকৃত সুবিধাভোগী সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ (ডিএসআর) চালুর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের সমন্বিত সামাজিক তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করে সফলতা অর্জন করেছে।
তবে প্রযুক্তি কখনোই মানবিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বিকল্প হতে পারে না। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ডিজিটাল ডাটাবেজও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ভাতার পরিমাণ। বর্তমানে বয়স্ক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতাও একই পরিমাণে উন্নীত করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান বাজার বাস্তবতায় এই অর্থ কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, ওষুধ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে একজন প্রবীণ মানুষের মাসিক ন্যূনতম ব্যয় কয়েক হাজার টাকার নিচে নামানো কঠিন। সে তুলনায় ৭০০ টাকার ভাতা নিঃসন্দেহে অপর্যাপ্ত। ফলে ভাতার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে ভাতা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তাকে শুধু নগদ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক বীমা যুক্ত করতে হয়।
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা এখানেই। অধিকাংশ কর্মসূচি নগদ সহায়তা নির্ভর। অথচ বেকার ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা, প্রবীণ পেনশন, কর্মক্ষমতা উন্নয়ন বা পুনঃপ্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসূচি এখনও সীমিত।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হিমশিম খায়। অন্যদিকে ব্যাংকঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির এই বিশাল ব্যয়ভার দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে হলে কর ব্যবস্থার সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধের কোনো বিকল্প নেই।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য। সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে অনেক সময় শুধুই ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছালে তা স্থানীয় বাজারে ব্যয় হয়, চাহিদা বৃদ্ধি করে, ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
২০১৫ সালে প্রণীত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে কর্মসূচিগুলোর সমন্বয়, দ্বৈততা দূরীকরণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এক দশক পরও সেই সুপারিশের বড় অংশ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বরাদ্দ বাড়ানো নয়, বরং সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। বরাদ্দের অঙ্ক যত বড়ই হোক, যদি প্রকৃত দরিদ্র তার ন্যায্য অধিকার না পায়, তাহলে সেই ব্যয়ের সামাজিক সুফল সীমিতই থেকে যাবে।
অতএব, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সম্প্রসারণকে স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো তার ওপর নয়; বরং কতটা দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে সেই অর্থ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো গেল তার ওপর। সামাজিক নিরাপত্তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কেবল ভাতা বিতরণের কর্মসূচি না হয়ে দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ