ad728

পাহাড় ধসের মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্তি চাই: পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই জীবন রক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১২ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

পাহাড় ধসের মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্তি চাই: পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
 
বর্ষা বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির এক অপার আশীর্বাদ। কৃষি, নদ-নদী, বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষায় বর্ষার অবদান অপরিসীম। কিন্তু এই বর্ষাই যখন চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে নেমে আসে, তখন তা হাজারো মানুষের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে ভয়, অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর প্রতীক হয়ে ওঠে। আকাশে কালো মেঘ জমলেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। রাতভর প্রবল বর্ষণের শব্দ তাদের কাছে প্রকৃতির সুর নয়, বরং মৃত্যুর পদধ্বনি। কারণ তারা জানেন না, ঠিক কোন মুহূর্তে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে তাদের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন ও জীবনকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি নিয়মিত মৌসুমি দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। অথচ এ ধরনের অধিকাংশ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। কারণ এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অপরিকল্পিত আচরণ, পরিবেশ ধ্বংস, অবৈধ দখল, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলার সম্মিলিত ফল।
বাংলাদেশের মানুষ আজও ভুলতে পারেনি ২০০৭ সালের ১১ জুনের সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা। কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের লালখান বাজার, মতিঝরনা, কুসুমবাগ, সেনানিবাসসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে একদিনেই ১২৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়। বহু পরিবার এক রাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর ২০১৭ সালের জুনে রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। উদ্ধারকাজে অংশ নিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও শহীদ হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও প্রায় প্রতি বর্ষায় কোথাও না কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। অর্থাৎ দুই দশকের অভিজ্ঞতার পরও আমরা কার্যকর শিক্ষা নিতে পারিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়গুলো মূলত টারশিয়ারি যুগের নরম বেলেপাথর, শেল ও সিল্টস্টোন দিয়ে গঠিত। এই মাটির অভ্যন্তরীণ বন্ধন তুলনামূলক দুর্বল। দীর্ঘ সময়ের ভারী বৃষ্টিতে পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে, ওজন বাড়িয়ে দেয় এবং ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। ফলে অভিকর্ষ বলের প্রভাবে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। কিন্তু এই ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতাই একমাত্র কারণ নয়। প্রকৃত বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে মানুষের সীমাহীন লোভ।
চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে আবাসন, মার্কেট, সড়ক, ইটভাটা, গুদাম, রিসোর্ট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল কেটে প্রায় খাড়া দেয়ালে পরিণত করায় সামান্য অতিবৃষ্টিতেই সেগুলো ধসে পড়ে।
আরেকটি বড় কারণ নির্বিচারে বন উজাড়। পাহাড়ের মাটি শক্তভাবে ধরে রাখে গাছের শিকড়। কিন্তু স্থানীয় বৃক্ষ কেটে বাণিজ্যিক গাছ লাগানো, অপরিকল্পিত জুম চাষ, অতিরিক্ত ভূমি ব্যবহার এবং বনভূমি উজাড়ের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। পাহাড়ে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটিকে দুর্বল করে দেয়।
সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা হলো, পাহাড়ধসে মারা যাওয়া অধিকাংশ মানুষ সমাজের দরিদ্র ও শ্রমজীবী শ্রেণির। নিরাপদ আবাসনের অভাবে তারা বাধ্য হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে বসবাস করেন। স্বল্প আয়ের কারণে তাদের সামনে কোনো বিকল্প থাকে না। অন্যদিকে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি পাহাড় কেটে সস্তা ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করলেও দুর্ঘটনার দায় কখনোই তাদের কাঁধে বর্তায় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব। আগে কয়েক দিন ধরে মাঝারি বৃষ্টিপাত হলেও এখন অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ হচ্ছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়বে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর Early Warning System বা পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। বিশ্বের উন্নত পাহাড়ি দেশগুলো বহু আগেই এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। জাপান, তাইওয়ান, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, নেপাল ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পাহাড়ের ঢালে স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিমাপক যন্ত্র, মাটির আর্দ্রতা পরিমাপক সেন্সর, ভূমির ক্ষুদ্রতম নড়াচড়া শনাক্তকারী ডিসপ্লেসমেন্ট সেন্সর, জিপিএস মনিটরিং এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত ঝুঁকিসীমা অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়, সাইরেন বেজে ওঠে এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা চালু করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে Automated Rain Gauge, Soil Moisture Sensor, Inclinometer, Ground Movement Sensor, ড্রোন এবং GIS-ভিত্তিক ডিজিটাল ঝুঁকি মানচিত্র স্থাপন করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বৃষ্টিপাত, মাটির আর্দ্রতা ও ঢালের পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে কয়েক ঘণ্টা আগেই সম্ভাব্য ধসের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এরপর Cell Broadcast, SMS, ভয়েস কল, মোবাইল অ্যাপ এবং স্থানীয় সাইরেনের মাধ্যমে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যাবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বে একটি সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আধুনিক পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের কারণে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি অতীতের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কমেছে। একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা পাহাড়ধস মোকাবিলায়ও গ্রহণ করা সম্ভব।
শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ। পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং অবৈধভাবে কাটা পাহাড় পুনরুদ্ধারে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
পাহাড় পুনর্বাসনে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। গভীর শিকড়বিশিষ্ট দেশীয় বৃক্ষ, বাঁশ, বিন্না (Vetiver) ঘাসসহ মাটি ধরে রাখে এমন উদ্ভিদ রোপণ করতে হবে। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক রিটেইনিং ওয়াল, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ঢাল স্থিতিশীল করার প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ের গায়ে বৃষ্টির পানি জমে থাকাই ধসের অন্যতম কারণ; তাই পানি দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী জাতীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে পাহাড়ের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকায় সমন্বয়ের অভাব প্রকট। একটি একক কর্তৃপক্ষ গঠন করে পাহাড় সংরক্ষণ, ডিজিটাল ঝুঁকি মানচিত্র প্রণয়ন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব অর্পণ করা উচিত।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সমস্যার সমাধান হবে না। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের বহুতল আবাসন, ভাড়াভিত্তিক ডরমিটরি এবং কর্মস্থলের কাছাকাছি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া মানুষ জীবিকার তাগিদে আবারও সেই মৃত্যুফাঁদেই ফিরে যাবে।
এছাড়া পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার হালনাগাদ ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি, বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্যোগ শিক্ষা, নিয়মিত মহড়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিউনিটি রেসপন্স টিম গড়ে তোলা এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়; এগুলো দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, পানির উৎস, পর্যটন অর্থনীতি এবং জলবায়ু নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। পাহাড় ধ্বংস মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ধ্বংস করা। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ধসে যে প্রাণহানি ঘটে, তা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; বরং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ঘাটতির নির্মম প্রতিফলন।
আর কত প্রাণহানি হলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে? আর কত শিশু এতিম হলে, কত মায়ের বুক খালি হলে আমরা বুঝব যে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই অধিক কার্যকর? এখনই সময় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কঠোর আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক পুনর্বাসনের সমন্বয়ে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণের। আধুনিক পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পুনর্বাসন এবং টেকসই পাহাড় ব্যবস্থাপনাই পারে এই বার্ষিক মৃত্যুমিছিল থামাতে। পাহাড় বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলেই নিরাপদ থাকবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক, সাংবিধানিক ও মানবিক দায়িত্ব।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ