বিশ্বসেরা ইসলামী ব্যাংক বির্নিমানে রাষ্ট্রীয় প্রয়াস
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ১১ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
বিশ্বসেরা ইসলামী ব্যাংক বির্নিমানে রাষ্ট্রীয় প্রয়াস
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
একটি স্বপ্ন, যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের আর্থিক শ্রেষ্ঠত্ব; লক্ষ্য একটি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’কে বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০০-এর তালিকায় স্থাপন করা। এই বিশাল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল বিপুল পরিমাণ মূলধন বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় এমন এক সমন্বিত কৌশলগত নেতৃত্বের, যার শিক্ষাগত ভিত্তি সুদৃঢ়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত। বাংলাদেশের উচ্চ-আমলাতন্ত্রে সম্প্রতি যে সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তার শিক্ষাগত প্রোফাইল ও প্রশাসনিক অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে, তাদের সম্মিলিত গুণাবলী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারা এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এক অনন্যসাধারণ প্রস্তুতি নিয়ে আছেন। তাদের বিশেষায়িত ডিগ্রি এবং কৌশলগত পদবিগুলোর সঠিক সমন্বয়ই এই নতুন বৈশ্বিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটির সফল যাত্রার ভিত্তি রচনা করতে পারে।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনার এই বিশাল ক্যানভাসের পাশাপাশি, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (FID) সচিব নাজমা মোবারেক-এর ওপর ন্যস্ত। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য স্বচ্ছতা এবং কঠোর পরিপালন (Compliance) অপরিহার্য। নাজমা মোবারেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও , তিনি তাঁর পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত বিশেষায়নের দিকে ঝুঁকেছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফিন্যান্সে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন । এই ডিগ্রি তাকে কেবল আর্থিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো বোঝা বা জন-অর্থনীতি (Public Finance) পরিচালনার জ্ঞানই দেয়নি, বরং সমাজবিজ্ঞানের পটভূমি তাকে ব্যাংকিং নীতিমালার সামাজিক প্রভাব এবং গ্রাহককেন্দ্রিক নৈতিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। FID-এর সচিব হিসেবে তার ভূমিকা ব্যাংকিং, বীমা এবং পুঁজিবাজারের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তার এই বিশেষায়িত দক্ষতা নিশ্চিত করবে যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকটি কেবল মুনাফার দিকেই মনোযোগ দেবে না, বরং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জনকল্যাণমূলক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা মেনে চলবে, যা বিশ্বসেরা ব্যাংকের মর্যাদা অর্জনের জন্য একটি মৌলিক শর্ত।
এই কৌশলগত দলে রয়েছেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার। বিশ্বসেরা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যে ধরনের গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান প্রয়োজন, তার শিক্ষাগত প্রোফাইল ঠিক তারই প্রতিচ্ছবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএসএস (সম্মান) এবং এমএসএস ডিগ্রি অর্জনকারী ড. মজুমদার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভূ-অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক আর্থিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় এক সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। এই জ্ঞান একটি নতুন ব্যাংকের আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং বহুজাতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি এবং যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'গভর্ন্যান্স (রাজনৈতিক অর্থনীতি)' বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন । একটি বৈশ্বিক ব্যাংকের জন্য 'রাজনৈতিক অর্থনীতি'র ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি থাকা মানে হলো, ব্যাংকটি শুধু অর্থনৈতিক মডেলের ওপর নির্ভর করবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে কৌশল নির্ধারণে সক্ষম হবে। এই গভীর একাডেমিক ভিত্তি, যা তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)-এ মাস্টার্স পর্যায়ের কোর্সে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাত্ত্বিক বিতরণের মাধ্যমে আরও সুসংহত করেছেন , তা ব্যাংকটিকে বৈশ্বিক মঞ্চে এক নির্ভরযোগ্য ও তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
এই বৈশ্বিক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে যে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজন, তার দায়িত্বে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব এম সাইফুল্লাহ পান্না এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী। এম সাইফুল্লাহ পান্না প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিবের মতো কৌশলগত পদে নিয়োজিত থাকায় , তিনি সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তরে এই ব্যাংকিং উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন। এই পদটি একটি নতুন জাতীয় উদ্যোগের জন্য 'ওয়ান-স্টপ' সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে, মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) সচিব হিসেবে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক ঋণ, বৈদেশিক অনুদান এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের সমন্বয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০০-এ স্থান পেতে হলে ব্যাংকটিকে প্রচুর আন্তর্জাতিক মূলধন এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। ERD সচিবের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালনা হওয়ায়, এটি ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (IsDB), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলির সাথে কার্যকর অংশীদারিত্ব এবং পুঁজি সংগ্রহের পথ খুলে দেবে।
নীতিগত এবং নৈতিক কাঠামোর জন্য অনিবার্য ভূমিকা পালন করছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন। একটি ইসলামী ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো শরিয়াহ পরিপালন এবং নৈতিক অর্থায়ন। কামাল উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণ বিষয়ে বিএসএস (সম্মান) এবং এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন , যা তাকে সমাজের মৌলিক চাহিদা এবং মানবিক নীতিগুলির প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছে—যা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি মূল দর্শন। পাশাপাশি, তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ম্যাক্রো-ইকোনমিক বিশ্লেষণ'-এর উপর স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে পেশাদার সার্টিফিকেট কোর্স' সম্পন্ন করেছেন । এই মিশ্র পটভূমি নিশ্চিত করে যে, ব্যাংকটি তার ধর্মীয় ও নৈতিক লক্ষ্যগুলি বজায় রেখেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন এবং ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
পরিশেষে, নীতি প্রণয়নকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে তার ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন অর্থ বিভাগের যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমিন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম-সচিব শেখ ফরিদ। এই কর্মকর্তারা আর্থিক প্রশাসন এবং নিয়ন্ত্রক পরিপালনের প্রথম সারির যোদ্ধা । নীতিগত নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক কৌশল প্রণীত হওয়ার পর, মাঠ পর্যায়ে সেগুলির নির্ভুল এবং সময়োপযোগী বাস্তবায়ন এই যুগ্ম-সচিবদের দৈনন্দিন দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। তাদের দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক নীতিনির্ধারণী কাঠামোর নিবিড় জ্ঞান ব্যাংকের নতুন নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা এবং অভ্যন্তরীণ অপারেশনাল সক্ষমতা নিশ্চিত করবে।
এই সাতজন কর্মকর্তার সম্মিলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা একটি সাধারণ ব্যাংকিং উদ্যোগের ঊর্ধ্বে এক সমন্বিত কৌশলগত শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ড. মজুমদারের গভর্ন্যান্স ও ম্যাক্রো-ইকোনমিক্স, নাজমা মোবারেক এর ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট ও নিয়ন্ত্রক দক্ষতা, কামাল উদ্দিনের নৈতিক ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জ্ঞান, এবং এম সাইফুল্লাহ পান্না ও মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর কৌশলগত সমন্বয় ক্ষমতা এই সবই সম্মিলিতভাবে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'কে শুধুমাত্র একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণকারী, নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী বিশ্বসেরা ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এই সাত সদস্যের উচ্চ-প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভিত্তি বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনার সম্ভাবনা বহন করে।
প্রজাতন্ত্রের এই সাত মেধাবী কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে আছে ৫ ব্যাংকের ১৮ হাজারের বেশি কর্মকর্তা, লক্ষাধিক গ্রাহক ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তারা। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ মডেলের মতো, এই মডেলের সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে আর্থিক খাতের সংস্কার ও ব্যবস্থাপনার রোল মডেল হিসেবে সম্মানজনক অবস্থানের দিকে নিয়ে যাবে বলে আশাবাদী আমরা সবাই।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন :