ad728

ধানের শীষের জোয়ার বনাম নীরব মেরুকরণ: অর্থনীতির কঠিন চোরাবালিতে বিএনপির রাজসিক প্রত্যাবর্তন


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

ধানের শীষের জোয়ার বনাম নীরব মেরুকরণ: অর্থনীতির কঠিন চোরাবালিতে বিএনপির রাজসিক প্রত্যাবর্তন
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
 
বাংলাদেশের রাজনীতির এই যে প্রলয়ংকরী রূপান্তর, যেখানে ধুলো ওড়ানো ঝড়ের বেগে বিএনপি মসনদের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেই দৃশ্যপটে সবচাইতে অদ্ভুত আর খটকা লাগার মতো বিষয়টি কিন্তু কোনো লুকানো ক্যামেরা বা ড্রোন শটে ধরা পড়ার মতো নয়। এটা অনুভবের বিষয়, হিসাবের খাতা মেলানোর বিষয়। আমরা যারা চার্ট, গ্রাফ আর জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে রাতদিন পড়ে থাকি, আমাদের কাছে এই ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বা ভূমিধস বিজয়ের চেয়েও রহস্যময় ঠেকছে সেই নিভৃত কোণে ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় ভোটব্যাংক। দেড় দশকের এক দীর্ঘ নির্বাসন, শীর্ষ নেতাদের হারানো আর আক্ষরিক অর্থেই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি দলের বাক্সে কীভাবে এতগুলো সিল পড়ল, তা নিয়ে চারদিকে যে নীরবতা, তা আসলে আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস ছাড়া আর কিছু নয়। এই গোলকধাঁধায় বিএনপির জন্য বিজয়োল্লাস যতটা স্বাভাবিক, সামনের দিনগুলোতে নিজেদের অস্তিত্ব আর ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখার লড়াইটা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কঠিন হতে চলেছে। রাজনীতির এই জটিল রসায়নে যখন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর গন্ধ পাওয়া যায়, তখন বুঝতে হবে দাবার বোর্ডে এমন কিছু ঘুঁটি চালা হয়েছে যা হয়তো মূল খেলোয়াড়দেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই যে ছায়া শক্তির উত্থান, তাকে বিএনপি কীভাবে সামাল দেবে এবং বিশ্ববাজারের এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে।
আসলে মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ যখন পরিবর্তনের আশায় ভোটকেন্দ্রে গিয়েছে, তাদের সামনে বিএনপির বিকল্প বলতে তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু জামায়াতের এই ‘সাইলেন্ট রাইজ’ বা নীরব উত্থান কোনোভাবেই কেবল ধর্মীয় আবেগের ফসল হতে পারে না। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি যখন ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করি, তখন দেখি অনেক শিল্পাঞ্চল বা গ্রামগঞ্জে যেখানে বিএনপির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকার কথা ছিল, সেখানে জামায়াত দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে এক বিশাল ভোটের ব্যবধানে। এটা কি স্রেফ সাংগঠনিক শক্তি? মোটেও না। এর পেছনে এক ধরনের ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার সূক্ষ্ম কারসাজি স্পষ্ট। পর্দার আড়ালের কুশীলবরা সম্ভবত চেয়েছে বিএনপি যেন এককভাবে বিপুল ক্ষমতার মালিক না হতে পারে। কারণ ইতিহাস বলে, বাংলাদেশে যখনই কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। তাই বিএনপিকে চাপে রাখার জন্য একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার ফোর্স’ বা প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতকে মাঠে রাখা হয়েছে। এই ইঞ্জিনিয়ারিং যদি সত্য হয়, তবে তা বিএনপির জন্য এক বিশাল ফাঁদ। 
সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটা হলো আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গোলকধাঁধা। আমরা যদি আরএমজি বা তৈরি পোশাক খাতের দিকে তাকাই, তবে দেখব আমাদের মূল ক্রেতা হলো ইউরোপ আর আমেরিকা। তারা জামায়াতের মতো কোনো কট্টর ডানপন্থী শক্তির উত্থানকে কখনোই ভালো চোখে দেখবে না। জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য যে স্থিতিশীল আর অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ দরকার, সেখানে জামায়াতের এই বিপুল ভোটপ্রাপ্তি এক ধরনের নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত ভিতু প্রজাতির প্রাণী; তারা সামান্য অনিশ্চয়তা দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই বিএনপির বড় কাজ হবে তাদের ক্যাবিনেট বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন এক বার্তা দেওয়া যা আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করবে যে দেশ কোনো উগ্রবাদের পথে যাচ্ছে না। স্রেফ রাজনৈতিক জয় দিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটে না, আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন তলানিতে, তখন কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার বিলাসিতা বিএনপির সাজে না।
অনেকে বলছেন জামায়াতের এই ভোট আসলে তাদের নিজস্ব ভোটার। কিন্তু পনেরো বছর ধরে যারা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করতে পারেনি, তাদের পক্ষে এত বড় সমর্থন গোছানো গাণিতিকভাবে অসম্ভব। এখানে একটা বড় ধরনের ‘ডেটা ম্যানিপুলেশন’ বা ভোটের অঙ্কে কৃত্রিম প্রলেপ থাকার জোরালো সন্দেহ আছে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, এই বাড়তি ভোটের বোঝা আসলে তাদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ জারি করার কৌশল। জামায়াত যদি রাজপথে বা সংসদে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি সঞ্চয় করে ফেলে, তবে সরকার পরিচালনা করা হবে এক দুঃস্বপ্ন। প্রতিটি সিদ্ধান্তে তখন ধর্মীয় উন্মাদনা বা কট্টরপন্থার চাপ থাকবে, যা আধুনিক অর্থনীতির চাকা সচল করার পথে বড় বাধা। তার চেয়ে বড় কথা, তরুণ প্রজন্ম যারা এবার প্রথম ভোট দিয়েছে, তারা চায় কর্মসংস্থান আর ডিজিটাল অর্থনীতি। তারা মধ্যযুগীয় কোনো ধ্যান-ধারণার বাস্তবায়ন দেখতে চায় না। 
বর্তমানে বাংলাদেশের যে ঋণের বোঝা এবং ব্যাংকিং খাতের যে লন্ডভন্ড অবস্থা, তা ঠিক করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের চেয়েও বেশি প্রয়োজন এক ধরনের বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক সংস্কার। কিন্তু জামায়াতের মতো দলগুলো যখন রাজনীতির মূল ধারায় নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন সব মনোযোগ চলে যায় পরিচয়বাদী রাজনীতির দিকে। অথচ এখন সময় ছিল কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো বা পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা নিয়ে কাজ করার। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে এই মুহূর্তে জামায়াতের উত্থান নিয়ে প্রকাশ্যে অতি-উৎসাহ না দেখিয়ে বরং নিজেদের শাসনপদ্ধতিকে স্বচ্ছ করা। ইঞ্জিনিয়ারিং করে যে ফল বানানো হয়েছে, তাকে রুখে দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো সুশাসন। জনগণ যদি দেখে বিএনপি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, তবে জামায়াত বা অন্য কোনো উগ্রপন্থী শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, জামায়াত কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়; তারা একটি ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক শক্তি। তাদের এই রহস্যজনক ভোটপ্রাপ্তি আসলে বিএনপির জন্য একটি সতর্কঘণ্টা, যা বলছে যে জয়ের আনন্দে বিভোর হওয়ার সময় এখনো আসেনি।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। একপাশে ভারত, অন্যপাশে চীন আর মাথার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অদৃশ্য নজরদারি। এই ত্রিমুখী চাপে টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। জামায়াতের সাথে অতীত জোটের কারণে বিএনপিকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের দরবারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখনই কোনো দেশে কট্টরপন্থার প্রভাব বাড়ে, তখন সেখানে মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেন ত্বরান্বিত হয়। আমাদের দেশের দক্ষ জনশক্তি যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়, তবে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্নটা স্রেফ কাগজের দলিল হয়েই থেকে যাবে। 
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা। সেখানে জামায়াতের এই ভোটপ্রাপ্তিকে অনেকেই স্বাভাবিক বলে চালানোর চেষ্টা করছেন, যেন এটা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ফল। কিন্তু আমরা যারা ক্ষমতার খোঁজ রাখি, তারা জানি যে এই সংখ্যাগুলো ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে। বিএনপিকে দুর্বল রাখার জন্য এই যে কৃত্রিম ‘পোলারাইজেশন’ বা মেরুকরণ তৈরি করা হলো, তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ। কারণ জামায়াতের মতো শক্তির উত্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ভারতের মতো দেশগুলো যদি নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের সাথে বাণিজ্যিক লেনদেন কমিয়ে দেয়, তবে আমাদের সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে। পেঁয়াজ থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার কাঁচামাল—সবকিছুর দাম তখন আকাশচুম্বী হবে। একজন কলামিস্ট হিসেবে আমি বলতে চাই, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে রাজনীতির মাঠকে উগ্রবাদমুক্ত রাখা জরুরি। বিএনপিকে বুঝতে হবে যে তাদের বিজয় আসলে একটি শর্তসাপেক্ষ বিজয়। এই শর্ত হলো গণতন্ত্র আর অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন।
আজ যে অদৃশ্য হাত জামায়াতকে ভোটের মাঠে টেনে তুলেছে, কাল সেই একই হাত বিএনপিকে টেনে নিচে নামাতে দ্বিধা করবে না। এই চক্রান্তের জাল ছিন্ন করতে হলে বিএনপিকে তাদের পুরোনো ঘরানার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, যখনই কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, তারা একটি জাতীয়তাবাদী দল, কোনো ধর্মভিত্তিক সংগঠন নয়। তাদের শক্তির উৎস হওয়া উচিত সাধারণ মানুষ, কোনো বিশেষ মহলের গোপন হিসাব নয়।
আসলে আগামী দিনের রাজনীতি আর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে বিএনপিকে এক ধরনের ‘ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দিতে হবে। জামায়াতের উত্থানকে পুঁজি করে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়, তাদের রুখে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন—সবখানে যদি পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে এই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ সংস্কৃতি চলতেই থাকবে। জামায়াতের এই ভোট হয়তো কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বার্তা যে রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে পারেনি। বিএনপি যদি এই বার্তাকে গুরুত্ব না দেয়, তবে তারা আগামীতে আরও বড় কোনো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। দেশের সাধারণ মানুষ চায় শান্তি আর দুবেলা দুমুঠো অন্ন। তারা রাজনীতির এই জটিল অঙ্ক বোঝে না। কিন্তু যখন চালের দাম বাড়বে আর রাস্তায় উগ্রবাদের আস্ফালন দেখবে, তখন তারা ঠিকই ক্ষোভে ফেটে পড়বে।
যাই হোক, সত্যটা হলো বাংলাদেশের ক্যানভাসে এখন অনেকগুলো রঙের প্রলেপ পড়েছে। এর মধ্যে ধানের শীষের সবুজ যেমন আছে, তেমনি জামায়াতের সেই বিতর্কিত ছায়াও দীর্ঘতর হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বকে এখন চাণক্যের মতো বুদ্ধিমান হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে কেন তাদের মিত্ররাই তাদের বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। এই রহস্যজনক ভোটপ্রাপ্তি আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল। বিএনপিকে চাপে রেখে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই এর মূল লক্ষ্য। বিএনপি যদি এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে চায়, তবে তাদের উচিত হবে জনগণের ওপর আস্থা রাখা এবং কোনো প্রকার গোপন আঁতাতের পথে না হাঁটা। একমাত্র স্বচ্ছতা আর জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই পারে এই অদৃশ্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জাল ছিন্ন করতে। আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি কতটা সাহসের সাথে জামায়াতের এই নীরব উত্থানকে মোকাবিলা করতে পারে তার ওপর। উৎসবের ডামাডোল থামলেই আসল লড়াই শুরু হবে, আর সেই লড়াইয়ে জিততে হলে চাই সুতীক্ষ্ণ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আর ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বিএনপিকে মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্রক্ষমতা একটি গুরুভার দায়িত্ব। বিশেষ করে যখন বিশ্ব অর্থনীতি এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে নিজেদের ঘর গোছানো আর প্রতিপক্ষের সীমারেখা নির্ধারণ করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। জামায়াতের এই উত্থান যদি সত্যিই কোনো কৃত্রিম প্রক্রিয়ার ফসল হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত। এই সংকেতকে অবজ্ঞা করলে তার মাশুল দিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে। তাই সময় এসেছে গভীর বিশ্লেষণের, সময় এসেছে ধীরস্থিরভাবে কদম ফেলার। রাজনীতির এই জটিল দাবার বোর্ডে বিএনপি যেন নিজের দেওয়া চালে নিজেই মাত না হয়ে যায়, সেটাই এখন কাম্য। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক পরিবর্তনের স্বাদ পেয়েছে, এই স্বাদ যেন কোনো তিতকুটে অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায় এখন এককভাবে বিএনপির কাঁধে। আগামী দিনগুলোতে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ফুটে ওঠে দেশপ্রেম আর বিচক্ষণতার ছাপ, তবেই হয়তো এই গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির পথ পাওয়া যাবে।
আসলে সবকিছুর মূলে রয়েছে আস্থার সংকট। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে যায়, তখনই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মতো শব্দগুলো ডালপালা মেলে। বিএনপিকে এই বিশ্বাসের জায়গাটা নতুন করে গড়তে হবে। তারা যদি সফলভাবে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পারে এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের নাগালে আনতে পারে, তবে মানুষ আর কোনো বিকল্প বা উগ্র শক্তির দিকে ঝুঁকবে না। জামায়াতের উত্থান আসলে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি, যা সুশাসনের অভাব থেকে তৈরি হয়। বিএনপিকে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে মেধা আর দক্ষতা দিয়ে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাটাই হবে বিএনপির জন্য সেরা রাজনৈতিক ঢাল। যখন দেশে কলকারখানা চলবে, মানুষের আয় বাড়বে, তখন কেউ আর ধর্মের নামে রাজনীতি করার রসদ পাবে না। এই সহজ সত্যটি যদি বিএনপির নীতিনির্ধারকরা অনুধাবন করতে পারেন, তবেই তারা এই গোলকধাঁধা থেকে সগৌরবে বেরিয়ে আসতে পারবেন। বাংলাদেশের রাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে বিএনপির সামনে যেমন বিশাল সুযোগ আছে, তেমনি আছে খাদের কিনারে পড়ে যাওয়ার ভয়। জয়ী হওয়া সহজ, কিন্তু সেই জয়কে সার্থক করাটাই হলো আসল বীরত্ব।বিএনপির উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক কাউন্সিল গঠন করা, যা কেবল এই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
Email : msislam.sumon@gmail.com

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ