ad728

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা: নীতি সংস্কার ও সৌর বিপ্লবের অপরিহার্যতা


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা: নীতি সংস্কার ও সৌর বিপ্লবের অপরিহার্যতা
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

বাংলাদেশ আজ এক গভীর জ্বালানি সংকটের বাস্তবতার মুখোমুখি। গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে কলমে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতা, আমদানি নির্ভরতা, উচ্চমূল্য এবং আর্থিক চাপ-সব মিলিয়ে পুরো খাতটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ডলারের সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর শক্তি, একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে সামনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-যে খাতটি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, সেই খাতেই বিদ্যমান নীতিগত অসামঞ্জস্য ও কর কাঠামোর কারণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

করছে। এর বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি এখনো আমদানি নির্ভ। এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, যা আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বর্তমানে এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়ে থাকে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২,৫০০ এমএমসিএফডির বেশি হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে ৮৫০ থেকে ৯০০ এমএমসিএফডিতে। ফলে প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ মাত্র ৩৫-৪০ দিনের, যা উন্নত দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প ও কৃষিতে। গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনশীলতা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে যা রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো অর্থনীতির ওপর একটি চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে 'ক্যাপাসিটি চার্জ'-যে অর্থ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রদান করে থাকে। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চাপ বাড়ছে অন্যদিকে সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই বিপুল ব্যয়ের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ কি কাঙিক্ষত সুবিধা পাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, লোডশেডিং এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি, বিদ্যুতের দাম বারবার বাড়ছে এবং সেবার মান নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ।

এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর বিদ্যুৎ, বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশে বছরে গড়ে ৩০০ দিনের বেশি সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা সৌর শক্তি ব্যবহারের জন্য একটি বড় সুবিধা। ইতোমধ্যে গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য এসেছে। তবে বৃহৎ পরিসরে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ আমদানি শুল্ক। বর্তমানে দেশে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আমদানিতেও উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ-যেমন ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও চীন-নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে কর ছাড়, ভর্তুকি এবং সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে। ফলে তারা দ্রুত এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে উচ্চ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে এই খাতকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এটি শুধু নীতিগত বৈপরীত্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলেও বিবেচিত হতে পারে।

যদি সৌর যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে ব্যক্তি পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। শহরাঞ্চলের বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত এবং শিল্পকারখানায় ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন সহজ হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, বিদ্যুৎ ঘাটতি হ্রাস পাবে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির প্রয়োজন কমে আসবে।

একইসঙ্গে নেট মিটারিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। এতে গ্রাহকরা তাদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবেন। এটি একদিকে যেমন জনগণকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করবে।

এছাড়া সরকার যদি স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা প্রদান করে, কর অবকাশ দেয় এবং স্থগিত থাকা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে, তাহলে এই খাতে বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে। রুফটপ সোলার কর্মসূচি পুনরায় চালু, সৌরচালিত সেচ পাম্প সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ পর্যায়ে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রসার-এসব উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একইসঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জের বর্তমান কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা অতীব জরুরি। অদক্ষ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি লাভজনক হবে। এতে শুধু আর্থিক সাশ্রয়ই হবে না, পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত হবে।

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখোমুখি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং পরিবেশগত দিক থেকেও অপরিহার্য।

সবশেষে, সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা সম্পর্কে জানাতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে সৌর বিদ্যুৎ শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট একটি কঠিন বাস্তবতা হলেও এর সমাধান অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সৌর যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো এবং বিদ্যুৎ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস-এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ একটি টেকসই, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। এখনই সময়-নীতিগত সাহস দেখানোর এবং ভবিষ্যৎ

প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার। লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ