“‘না বুঝে হ্যাঁ’—সালাউদ্দিন আহমেদের কথায় বিতর্কের আগুন”
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
“‘না বুঝে হ্যাঁ’—সালাউদ্দিন আহমেদের কথায় বিতর্কের আগুন”
ডা. সিদ্দিকুর রহমান প্রামানিক :
জনগণের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে কেবল একটি বক্তব্য দেওয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর আঘাত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ-এর “জনগণ না বুঝে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে” মন্তব্যটি তাই শুধু বিতর্কিত নয়, বরং গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো জনগণের মতামত। এই মতামত কখনোই নিখুঁত নয়, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত—কারণ জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সেখানে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মুখে যখন শোনা যায় যে জনগণ “না বুঝে” ভোট দিয়েছে, তখন প্রশ্ন জাগে—তাহলে কি আমরা একটি অভিভাবকতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বসবাস করছি, যেখানে শাসকগোষ্ঠীই ঠিক করবে জনগণ কী বুঝবে, কী বুঝবে না?
এই বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের অবজ্ঞা স্পষ্ট। যেন জনগণ কেবল ভোট দেওয়ার যন্ত্র, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। অথচ ইতিহাস অন্য কথা বলে। ১৯৭১ সালে এ দেশের সাধারণ মানুষই বুঝেছিল স্বাধীনতার মূল্য; ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তারাই বুঝেছিল গণতন্ত্রের গুরুত্ব। তখন কি কেউ তাদের “না বোঝা” বলে অবজ্ঞা করার সাহস দেখিয়েছিল?
রাজনীতিতে পরাজয় বা অপ্রত্যাশিত ফলাফল নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই ফলাফলকে জনগণের অজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা এক ধরনের আত্মসমালোচনার অক্ষমতা। প্রকৃত নেতারা জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন, নিজেদের ব্যর্থতা খুঁজে বের করেন। বিপরীতে যারা জনগণকেই দোষারোপ করেন, তারা মূলত নিজের দায় এড়ানোর পথ খোঁজেন।
উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে যখন সরকার জনসমর্থন হারায়, তখন তারা জনগণের বিচক্ষণতাকে প্রশ্ন না তুলে নিজেদের নীতি ও কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করে। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটে যখন জনগণের সিদ্ধান্তকে “না বোঝা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটি গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস প্রকাশ করে।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। যদি জনগণের রায়কে “ভুল” বা “অজ্ঞতাপ্রসূত” বলা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। তখন গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
সুতরাং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য যুক্তিযুক্ত নয়—বরং এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন। একজন রাষ্ট্রনায়কের ভাষা হওয়া উচিত সংযত, সম্মানজনক এবং আত্মসমালোচনামূলক। জনগণকে ছোট করে নয়, তাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই রাজনীতির প্রকৃত সাফল্য আসে।
শেষ কথা—জনগণ কখনোই পুরোপুরি ভুল নয়। তারা কখনো বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু তাদের সেই বিভ্রান্তির পেছনে দায়িত্ব অনেক সময় রাজনীতিবিদদেরই। তাই জনগণকে দোষারোপ না করে, তাদের বোঝানোর দায়িত্বই হওয়া উচিত নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।
আপনার মতামত লিখুন :