ad728

ক্যাপাসিটি চার্জ’ ফাঁদ: জাতীয় অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধে চাই আমূল সংস্কার


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

ক্যাপাসিটি চার্জ’ ফাঁদ: জাতীয় অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধে চাই আমূল সংস্কার
মো. সাহিদুল ইসলাম সুমন
 
২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে তাকালে একটি রূঢ় ও অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। সেটি হলো—দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ উন্নয়নের সোপান হওয়ার বদলে জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল গলার কাঁটা বা ‘রক্তক্ষরণকারী ক্ষত’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ভাড়া বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাবদ রাষ্ট্রের ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৪২০ বিলিয়ন (৪২ হাজার কোটি) টাকায়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩২০ বিলিয়ন (৩২ হাজার কোটি) টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। একটি উন্নয়নশীল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে, যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের জন্য আমাদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে কোনো উৎপাদন ছাড়াই বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিলিয়ে দেওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী রাজনীতির মূল দর্শন ছিল জাতীয় স্বনির্ভরতা এবং প্রতিটি পয়সার উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিগত দেড় দশকের ‘লুটেরা অর্থনৈতিক মডেলে’র মাধ্যমে আমাদের সেই দর্শন থেকে বিচ্যুত করে এক আত্মঘাতী জ্বালানি কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ সেই বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জের এই মরণফাঁদটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের পরিভাষায় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ভাড়া—অর্থাৎ সরকার কোনো কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনুক বা না কিনুক, চুক্তি অনুযায়ী তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার বা টাকা পরিশোধ করতে হয়। পর্যালোচনা কমিটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অলস বসে আছে। আদানি পাওয়ারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার (যা প্রয়োজনের চেয়ে ৫০% বেশি) অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে। 
এই বিশাল অলস সক্ষমতার দায়ভার বহন করছে দেশের সাধারণ জনগণ। বিগত সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’—যা জনমনে ‘কালো আইন’ হিসেবে পরিচিত—তার মাধ্যমে কোনো টেন্ডার বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। আইনি ও কর্পোরেট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি ছিল মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থী এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতার অন্তরায়। এই আইনের ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে মুষ্টিমেয় কিছু বিশেষ সুবিধাভোগী শিল্পগোষ্ঠীকে অনৈতিক মুনাফা লাভের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অসংগতি নয়, বরং আমাদের সংবিধানের মৌলিক চেতনার সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। ২০২৬ সালে এসে এই সংকটের ভার এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে, দেশের ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না এবং বিপিডিবি (BPDB) এখন দেউলিয়া হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর। বিপিডিবি-র এই বিশাল লোকসান মেটাতে সরকার গত কয়েক বছরে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, যা মূলত জনগণের ওপর এই দুর্নীতির দায় চাপানোর এক কৌশল। এই মূল্যবৃদ্ধির চড়া মাসুল দিচ্ছে আমাদের শিল্প উৎপাদন খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাত, যা আমাদের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস, তা আজ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন আমাদের উৎপাদন খরচ কমানো প্রয়োজন, তখন উচ্চ বিদ্যুৎ মূল্যের কারণে আমরা মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি। শহীদ জিয়ার উন্নয়ন দর্শনে শিল্পায়ন ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার, কিন্তু বর্তমানের এই ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ মডেল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে গুটিকয়েক আইপিপি (IPP) মালিকের পকেট ভারী করছে। আমরা যদি আমাদের শিল্পায়ন এবং রফতানি বাজার টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে এই পরজীবী জ্বালানি নীতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।
বিদ্যুৎ খাতের এই অরাজকতা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) যখন দেখেন যে একটি দেশের জ্বালানি খাত অস্বচ্ছ চুক্তি এবং বিশাল ভর্তুকির ওপর টিকে আছে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। তাছাড়া, গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটের পেছনে অর্থ পাচারের (Money Laundering) একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ইনভয়েসিং জালিয়াতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির দাম বাড়িয়ে দেখিয়ে বিদেশে ডলার পাচার করার ভূরি ভূরি অভিযোগ আজ সামনে আসছে। ২০২৬ সালের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এ আমাদের প্রথম কাজ হতে হবে এই দুর্নীতির উৎসগুলোকে উপড়ে ফেলা। শহীদ জিয়ার '১৯-দফা' এবং বর্তমানের '৩১-দফা' রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি চুক্তির ‘ফরেনসিক অডিট’ হওয়া প্রয়োজন। যারা রাষ্ট্রের এই ৪২০ বিলিয়ন টাকা লোপাটের পেছনে দায়ী, তাদের আইনি কাঠামোর আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথটি খুব সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ নীতিতে ফিরে যাওয়া। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বিদ্যমান চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শকদের সহায়তায় পুনঃমূল্যায়ন (Renegotiate) করতে হবে। যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো কোনো অজুহাতেই আর নবায়ন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে আসতে হবে। এলএনজি বা কয়লা আমদানির পেছনে প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তার একটি ক্ষুদ্র অংশ যদি আমরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যয় করতাম, তবে আজ আমাদের এই দশা হতো না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যেভাবে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি খাতে বিপ্লব এসেছিল, আজ আমাদের তেমনিভাবে ‘জ্বালানি অনুসন্ধান বিপ্লব’ ঘটাতে হবে। বাপেক্স-কে শক্তিশালী করে বঙ্গোপসাগর ও সমতলে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা অবাস্তব কল্পনা মাত্র।
পরিশেষে বলতে চাই, ৪২০ বিলিয়ন টাকার এই ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটার একটি আধুনিক হাতিয়ার। আমরা যখন একটি বৈষম্যহীন এবং স্বচ্ছ বাংলাদেশের কথা বলি, তখন জ্বালানি খাতের এই লুটতরাজ মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের একজন আজীবন সদস্য এবং পার্বত্য অঞ্চলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন ও কৃষির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলেও আমাদের নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানের এই ‘চুক্তিভিত্তিক লুটপাটের’ সংস্কৃতি আমাদের সেই সম্ভাবনার টুঁটি চেপে ধরছে। বিদ্যুৎ খাতের এই বিশাল ভর্তুকি এবং ঋণের বোঝা কমাতে বিতর্কিত ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন বা বাতিল করার এবং আদানির সাথে চুক্তিটি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে পর্যালোচনার সুপারিশ করছেন সচেতন মহল। 
২০২৬ হোক লুণ্ঠনমুক্ত এবং স্বচ্ছ জ্বালানি খাতের সূচনাবছর। ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ইশতেহারে বিদ্যুৎ হবে উন্নয়নের বাহন, সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসা শোষণের বোঝা নয়। শহীদ জিয়ার সেই কালজয়ী চেতনাকে ধারণ করে আমরা যদি বিদ্যুৎ খাতকে সংস্কার করতে পারি, তবেই আমাদের অর্থনীতি আবারো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সার হিসাব নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
মো. সাহিদুল ইসলাম সুমন
 
২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে তাকালে একটি রূঢ় ও অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। সেটি হলো—দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ উন্নয়নের সোপান হওয়ার বদলে জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল গলার কাঁটা বা ‘রক্তক্ষরণকারী ক্ষত’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ভাড়া বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাবদ রাষ্ট্রের ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৪২০ বিলিয়ন (৪২ হাজার কোটি) টাকায়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩২০ বিলিয়ন (৩২ হাজার কোটি) টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। একটি উন্নয়নশীল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে, যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের জন্য আমাদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে কোনো উৎপাদন ছাড়াই বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিলিয়ে দেওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক লুণ্ঠন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী রাজনীতির মূল দর্শন ছিল জাতীয় স্বনির্ভরতা এবং প্রতিটি পয়সার উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু বিগত দেড় দশকের ‘লুটেরা অর্থনৈতিক মডেলে’র মাধ্যমে আমাদের সেই দর্শন থেকে বিচ্যুত করে এক আত্মঘাতী জ্বালানি কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ সেই বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জের এই মরণফাঁদটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের পরিভাষায় ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ভাড়া—অর্থাৎ সরকার কোনো কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনুক বা না কিনুক, চুক্তি অনুযায়ী তাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার বা টাকা পরিশোধ করতে হয়। পর্যালোচনা কমিটির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭,৭০০ থেকে ৯,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অলস বসে আছে। আদানি পাওয়ারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার (যা প্রয়োজনের চেয়ে ৫০% বেশি) অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে। 
এই বিশাল অলস সক্ষমতার দায়ভার বহন করছে দেশের সাধারণ জনগণ। বিগত সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’—যা জনমনে ‘কালো আইন’ হিসেবে পরিচিত—তার মাধ্যমে কোনো টেন্ডার বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। আইনি ও কর্পোরেট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি ছিল মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থী এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতার অন্তরায়। এই আইনের ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে মুষ্টিমেয় কিছু বিশেষ সুবিধাভোগী শিল্পগোষ্ঠীকে অনৈতিক মুনাফা লাভের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অসংগতি নয়, বরং আমাদের সংবিধানের মৌলিক চেতনার সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। ২০২৬ সালে এসে এই সংকটের ভার এতটাই অসহনীয় হয়ে উঠেছে যে, দেশের ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না এবং বিপিডিবি (BPDB) এখন দেউলিয়া হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর। বিপিডিবি-র এই বিশাল লোকসান মেটাতে সরকার গত কয়েক বছরে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, যা মূলত জনগণের ওপর এই দুর্নীতির দায় চাপানোর এক কৌশল। এই মূল্যবৃদ্ধির চড়া মাসুল দিচ্ছে আমাদের শিল্প উৎপাদন খাত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাত, যা আমাদের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস, তা আজ বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন আমাদের উৎপাদন খরচ কমানো প্রয়োজন, তখন উচ্চ বিদ্যুৎ মূল্যের কারণে আমরা মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিবেশীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি। শহীদ জিয়ার উন্নয়ন দর্শনে শিল্পায়ন ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার, কিন্তু বর্তমানের এই ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ মডেল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে গুটিকয়েক আইপিপি (IPP) মালিকের পকেট ভারী করছে। আমরা যদি আমাদের শিল্পায়ন এবং রফতানি বাজার টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে এই পরজীবী জ্বালানি নীতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।
বিদ্যুৎ খাতের এই অরাজকতা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) যখন দেখেন যে একটি দেশের জ্বালানি খাত অস্বচ্ছ চুক্তি এবং বিশাল ভর্তুকির ওপর টিকে আছে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। তাছাড়া, গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতের এই সংকটের পেছনে অর্থ পাচারের (Money Laundering) একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ইনভয়েসিং জালিয়াতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির দাম বাড়িয়ে দেখিয়ে বিদেশে ডলার পাচার করার ভূরি ভূরি অভিযোগ আজ সামনে আসছে। ২০২৬ সালের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এ আমাদের প্রথম কাজ হতে হবে এই দুর্নীতির উৎসগুলোকে উপড়ে ফেলা। শহীদ জিয়ার '১৯-দফা' এবং বর্তমানের '৩১-দফা' রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি চুক্তির ‘ফরেনসিক অডিট’ হওয়া প্রয়োজন। যারা রাষ্ট্রের এই ৪২০ বিলিয়ন টাকা লোপাটের পেছনে দায়ী, তাদের আইনি কাঠামোর আওতায় এনে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথটি খুব সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ নীতিতে ফিরে যাওয়া। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বিদ্যমান চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শকদের সহায়তায় পুনঃমূল্যায়ন (Renegotiate) করতে হবে। যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো কোনো অজুহাতেই আর নবায়ন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে আসতে হবে। এলএনজি বা কয়লা আমদানির পেছনে প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তার একটি ক্ষুদ্র অংশ যদি আমরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যয় করতাম, তবে আজ আমাদের এই দশা হতো না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যেভাবে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি খাতে বিপ্লব এসেছিল, আজ আমাদের তেমনিভাবে ‘জ্বালানি অনুসন্ধান বিপ্লব’ ঘটাতে হবে। বাপেক্স-কে শক্তিশালী করে বঙ্গোপসাগর ও সমতলে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা অবাস্তব কল্পনা মাত্র।
পরিশেষে বলতে চাই, ৪২০ বিলিয়ন টাকার এই ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটার একটি আধুনিক হাতিয়ার। আমরা যখন একটি বৈষম্যহীন এবং স্বচ্ছ বাংলাদেশের কথা বলি, তখন জ্বালানি খাতের এই লুটতরাজ মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের একজন আজীবন সদস্য এবং পার্বত্য অঞ্চলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন ও কৃষির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হলেও আমাদের নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানের এই ‘চুক্তিভিত্তিক লুটপাটের’ সংস্কৃতি আমাদের সেই সম্ভাবনার টুঁটি চেপে ধরছে। বিদ্যুৎ খাতের এই বিশাল ভর্তুকি এবং ঋণের বোঝা কমাতে বিতর্কিত ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন বা বাতিল করার এবং আদানির সাথে চুক্তিটি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে পর্যালোচনার সুপারিশ করছেন সচেতন মহল। 
২০২৬ হোক লুণ্ঠনমুক্ত এবং স্বচ্ছ জ্বালানি খাতের সূচনাবছর। ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ইশতেহারে বিদ্যুৎ হবে উন্নয়নের বাহন, সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসা শোষণের বোঝা নয়। শহীদ জিয়ার সেই কালজয়ী চেতনাকে ধারণ করে আমরা যদি বিদ্যুৎ খাতকে সংস্কার করতে পারি, তবেই আমাদের অর্থনীতি আবারো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সার হিসাব নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ