ad728

মা: সন্তানের প্রথম চিকিৎসক, প্রথম আশ্রয় মেডিকেল সাইন্সের আলোকে মা দিবসের বিশেষ ফিচার


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ১০ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

মা: সন্তানের প্রথম চিকিৎসক, প্রথম আশ্রয় মেডিকেল সাইন্সের আলোকে মা দিবসের বিশেষ ফিচার

ডা. সিদ্দিকুর রহমান প্রামানিক 


পৃথিবীতে “মা” শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, ত্যাগ, নিরাপত্তা ও নিঃস্বার্থ মমতার এক গভীর অনুভূতি। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মা শুধু আবেগের নাম নন; একজন মায়ের যত্ন, স্পর্শ, মানসিক অবস্থা এবং ভালোবাসা একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বৈজ্ঞানিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই মা দিবস কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার দিন নয়, এটি একজন মায়ের অসামান্য অবদানকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার দিন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো গর্ভকাল থেকে জন্মের পরের প্রথম কয়েক বছর। এই পুরো সময়জুড়ে একজন মা-ই শিশুর প্রথম নিরাপদ পৃথিবী। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ধীরে ধীরে গঠিত হয় এবং এ সময় মায়ের শরীর থেকেই সে পায় অক্সিজেন, পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের শক্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টিহীনতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অসুস্থতা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি মানসিক সমস্যার ঝুঁকি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিউরোসাইন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন সময়ে মায়ের মানসিক অবস্থা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সরাসরি প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকা মায়ের শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, একজন সুখী ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল মায়ের সন্তান সাধারণত বেশি আত্মবিশ্বাসী, সামাজিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে।
জন্মের পর শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হলো মায়ের বুকের দুধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের মতে, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র বুকের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বুকের দুধে থাকা অ্যান্টিবডি, প্রোটিন ও রোগ প্রতিরোধী উপাদান শিশুকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, হাঁপানি ও বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, বুকের দুধ পান করা শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও তুলনামূলক ভালো হতে পারে।
একজন মায়ের স্পর্শও শিশুর জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক থেরাপি। সন্তানকে কোলে নেওয়া, আদর করা কিংবা বুকের কাছে রাখার সময় মা ও শিশুর শরীরে “অক্সিটোসিন” নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে বলা হয় “লাভ হরমোন”। এই হরমোন শিশুর মানসিক নিরাপত্তা তৈরি করে, উদ্বেগ কমায় এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক বিকাশে সহায়তা করে। এ কারণেই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে জন্মের পরপরই নবজাতককে মায়ের বুকের উপর রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মা একজন শিশুর প্রথম মনোরোগ বিশেষজ্ঞও। শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচরণ গঠনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যেসব শিশু মায়ের স্নেহ, নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা পায়, তারা সাধারণত কম হতাশাগ্রস্ত হয় এবং জীবনে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বড় হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, পরিবারের সবার যত্ন নিতে গিয়ে অনেক মা নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন। চিকিৎসকরা বলছেন, একজন মায়ের সুস্থতা পুরো পরিবারের সুস্থতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও মানসিক প্রশান্তি একজন মায়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর অনেক মা “প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা” বা Postpartum Depression-এ ভোগেন, যা অনেক সময় পরিবার বুঝতেই পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সুস্থ, সচেতন ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মা মানেই একটি সুস্থ প্রজন্ম। তাই মা দিবসে শুধু ফুল বা উপহার নয়, মায়ের স্বাস্থ্য, সম্মান ও মানসিক সুখ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
মেডিকেল সাইন্স আজ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে—মা শুধু একজন জন্মদাত্রী নন; তিনি সন্তানের প্রথম চিকিৎসক, প্রথম শিক্ষক, প্রথম মনোবিজ্ঞানী এবং জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।  

লেখক পরিচিতি: বি ইউ এম এস ( ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডসিন এন্ড সার্জারী), এম পি এইচ (নিউট্রিশন) এইচ ইউ বি, ডি ইউ এম এস- ঢাকা, প্রতিষ্ঠাতা, মডার্ণ শেফা ক্লিনিক।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ