ad728

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর: সংস্কারের পথে ইতিবাচক সূচনা


FavIcon
নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত : ০৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছবির ক্যাপশন: ad728

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন গভর্নর: সংস্কারের পথে ইতিবাচক সূচনা
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
 
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি—এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব বহন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন একটি সংবেদনশীল সময়েই নতুন গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ অনেকের কাছেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার দেওয়া বার্তা এবং কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আবারও একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি সংস্কারমুখী কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, কিছু ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, পরিচালনা পর্ষদের অতি প্রভাব এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা—এসব কারণে ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ শুধু সময়োপযোগীই নয়, বরং অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে। যদিও চলতি সময়ে তা কিছুটা কমার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তবু মূল্যস্ফীতি এখনও সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে আছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৯ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশ পর্যায়ে রেখেছে। এর উদ্দেশ্য হলো বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা। তবে সুদের হার বাড়ানো বা কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগের ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা কার্যক্রমেও কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা। নতুন গভর্নরের সামনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকিং খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ঋণ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.১ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৮.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বৈষম্য অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি
[5:21 pm, 08/03/2026] জসিম 36 জুলাই: ফলে নতুন গভর্নরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমন ভাবে ব্যাংকিং খাতকে পরিচালনা করা যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে এবং অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হয়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিও গত কয়েক বছরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং ডলার বাজারের চাপের কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভ একসময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। যদিও এই পরিমাণ এখনও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় পুরোপুরি পৌঁছায়নি, তবুও এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন গভর্নরের দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করেও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৭ থেকে ৪.৯ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পূর্বাভাস কিছুটা বেশি—প্রায় ৫.৩৮ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত যদি সুস্থ ও স্থিতিশীল থাকে, তবে তা বিনিয়োগ ও শিল্পোন্নয়নের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো খেলাপি ঋণের সমস্যা। বিভিন্ন সময় নানা নীতিগত সুবিধা এবং পুনঃতফসিলের সুযোগের কারণে অনেক বড় ঋণখেলাপি সহজেই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে এবং সৎ ঋণগ্রহীতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নতুন গভর্নর যদি এই ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন এবং ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে পারেন, তাহলে ব্যাংকিং খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এছাড়া ব্যাংকগুলোর করপোরেট গভর্ন্যান্স বা পরিচালনা ব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অতি প্রভাব এবং স্বার্থসংঘাত ব্যাংক পরিচালনায় সমস্যা সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি ছাড়া এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। নতুন গভর্নর ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে কঠোর নীতি প্রয়োগ করা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা অনেকটাই ফিরে আসতে পারে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণও ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই খাতে নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন। নতুন নেতৃত্ব যদি প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সহায়ক হবে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধি করবে।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে, সেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলে নতুন গভর্নরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে—প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা বজায় রেখে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করা।
[5:21 pm, 08/03/2026] জসিম 36 জুলাই: সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও সম্ভাবনাময়। শিল্পায়ন, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে গত কয়েক দশকে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এই অগ্রগতি টেকসই রাখতে হলে আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য। নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে যদি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়—পুরো অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন নেতৃত্ব তাই নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা। প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবে সামনে পথ সহজ নয়। কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আবারও আস্থার জায়গায় ফিরে যেতে পারে। দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থেই এই সংস্কার প্রক্রিয়া সফল হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ