পণ্ডিতের পর ব্যবসায়ী: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে বাস্তববোধের প্রত্যাবর্তন?
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ০১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
পণ্ডিতের পর ব্যবসায়ী: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে বাস্তববোধের প্রত্যাবর্তন?
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি Bangladesh Bank–এর গভর্নর হিসেবে জনাব Md. Mostaqur Rahman, এফসিএমএ–কে নিয়োগ দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে জনপরিসরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে “মহাপণ্ডিত” মানুষের অভাব কখনও ছিল না। অর্থনীতির তাত্ত্বিক, আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করা গবেষক, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী—সবাই এই পদ অলংকৃত করেছেন। কেউ বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার একাডেমিক জগৎ থেকে সরাসরি নীতিনির্ধারণের আসনে বসেছেন। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—এই দীর্ঘ পাণ্ডিত্যপূর্ণ ঐতিহ্যের বাস্তব ফল কতটা স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে?
গত এক দশকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। Bangladesh Bank–এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্ব, বক্তৃতা ও সংস্কারের ঘোষণার ভিড়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—আমার ব্যাংক কি নিরাপদ?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্বই হলো মূল্যস্থিতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা দুর্বল হয়, তবে অর্থনীতির শিরা–উপশিরায় রক্তপ্রবাহই ব্যাহত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সিদ্ধান্তকে কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; এটি এক ধরনের নীতিগত বার্তাও বহন করে। এতদিন আমরা মূলত একাডেমিক বা আমলাতান্ত্রিক পটভূমির নেতৃত্ব দেখেছি। এবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যিনি ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন এবং পেশাগতভাবে একজন ফেলো কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
বাংলাদেশের আর্থিক রিপোর্টিং কাঠামো অনুযায়ী স্বীকৃত পেশাগত হিসাববিদদের প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো Institute of Cost and Management Accountants of Bangladesh, যার ফেলো সদস্য হওয়া দীর্ঘ পেশাগত অনুশীলন, পরীক্ষা ও নৈতিক মানদণ্ড পূরণের ফল। প্রায় বিশ কোটির দেশে এ ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সীমিত—এটি নিছক ডিগ্রি নয়, বরং একটি পেশাগত শৃঙ্খলার স্বীকৃতি।
আমাদের তথাকথিত সিভিল সোসাইটির একাংশের কাছে “ব্যবসায়ী” শব্দটি প্রায়শই সন্দেহের প্রতিশব্দ। যেন ব্যবসায়ী মানেই স্বার্থান্ধ, সংকীর্ণ ও কৌশলহীন চরিত্র। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতির ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। এই দেশের বেসরকারি খাতই শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনে যেসব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তা কেবল তাত্ত্বিক মডেল দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের করপোরেট ইতিহাসে Samson H. Chowdhury–এর মতো উদ্যোক্তারা দেখিয়েছেন, সুশাসন ও পেশাগত ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, যা জাতীয় অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিত দেয়।
একজন এফসিএমএ–এর ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কস্ট ও ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টরা কেবল হিসাব রক্ষণ করেন না; তারা ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, মূলধন দক্ষতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পারফরম্যান্স পরিমাপে প্রশিক্ষিত। উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্রেক-ইভেন বিশ্লেষণ, ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট ও বিনিয়োগের রিটার্ন নিরূপণ সরাসরি তাদের দক্ষতার আওতায় পড়ে। একটি দেশের উন্নয়নে শিল্পখাতের সক্ষমতা নির্ভর করে দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে এমন কেউ থাকেন, যিনি বাস্তব ব্যয় কাঠামো ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বোঝেন, তবে নীতিনির্ধারণে সেই বাস্তববোধ প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ব্যাংকিং সেক্টরের ক্ষেত্রেও একজন এফসিএমএ–এর বিশ্লেষণী ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণপোর্টফোলিওর গুণগত মান, প্রভিশনিং, সম্পদ–দায় ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিবরণীর যথার্থতা—এসব প্রশ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
গত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, ঋণ পুনঃতফসিল ও খেলাপি ঋণের ব্যবস্থাপনায় নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—পুনঃতফসিল হলো নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ পরিশোধের সময়সূচি পুনর্গঠন, আর খেলাপি ঋণ হলো চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধে ব্যর্থতা। এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা হলে বাস্তব চিত্র বিকৃত হয়। একজন পেশাগত হিসাববিদ নীতিগত শিথিলতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবেই অনুধাবন করেন।
অতীতে আমরা উচ্চশিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গভর্নর দেখেছি। তবু ব্যাংকিং খাতের সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। এর মানে এই নয় যে পাণ্ডিত্য অপ্রয়োজনীয়; বরং বোঝায়, তত্ত্ব ও বাস্তবের সমন্বয় না ঘটলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে একই সঙ্গে মুদ্রানীতি, আর্থিক তদারকি, বাজার আস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামলাতে হয়। এখানে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত, দ্রুত সংকট ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা।
সরকার যে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় তারা সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করেছে। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ হলো আস্থা পুনর্গঠন। যদি আমানতকারী বিশ্বাস না করেন যে তাঁর সঞ্চয় নিরাপদ, তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তিই নড়ে যায়।
নতুন গভর্নরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই আস্থা ফিরিয়ে আনা—স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ, কঠোর তদারকি এবং নীতিগত সামঞ্জস্যের মাধ্যমে।
এবার একজন ব্যবসায়ী–পটভূমির মানুষ দায়িত্ব পেয়েছেন—এতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বরং এটিকে একটি পরীক্ষামূলক মোড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। শিল্প ও উদ্যোক্তাদের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হতে পারে। তবে এটিও সত্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা খাতভিত্তিক পক্ষপাতের স্থান নেই; প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থই হবে একমাত্র মানদণ্ড। একজন এফসিএমএ হিসেবে পেশাগত আচরণবিধি ও নৈতিক মানদণ্ড তাঁকে সেই সীমারেখা রক্ষা করতে সহায়তা করবে বলেই প্রত্যাশা।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যক্তি নয়, ফলাফলকে বিচার করে। আগের মহাপণ্ডিতদের চেয়ে খারাপ করার সুযোগ খুব বেশি নেই—এই বক্তব্যে এক ধরনের হতাশার প্রতিফলন আছে, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে সম্ভাবনার ইঙ্গিত। যদি বাস্তববোধ, পেশাগত শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা একসঙ্গে কাজ করে, তবে এই নিয়োগ একটি ইতিবাচক বাঁক হতে পারে। এখন প্রয়োজন ধৈর্য, তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন এবং সময়ের সুযোগ দেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন মানেই অর্থনীতির তাৎক্ষণিক রূপান্তর নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াকে ফলপ্রসূ করতে হলে সমালোচনাও হতে হবে দায়িত্বশীল, আর সমর্থনও হতে হবে যুক্তিনির্ভর।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন :