সংকটকালে নেতৃত্বের প্রশ্ন: কেন বাস্তব অর্থনীতির মানুষ মোস্তাকুর রহমান হতে পারেন সময়ের সেরা গভর্নর।
নিজস্ব প্রতিবেদক
- প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সংকটকালে নেতৃত্বের প্রশ্ন: কেন বাস্তব অর্থনীতির মানুষ মোস্তাকুর রহমান হতে পারেন সময়ের সেরা গভর্নর।
মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
জনাব মোস্তাকুর রহমানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তবে তার চেয়েও বড় কথা, যারা তাকে শিল্পখাত, ব্যাংকিং–সংলাপ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন—তিনি কেবল একজন উদ্যোক্তা নন; তিনি আর্থিক কাঠামো বোঝেন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, এই বাস্তব জ্ঞানই হয়তো সবচেয়ে বড় সম্পদ।
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ইশতেহারে দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে—এটি নিছক রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি বিশাল আর্থিক ও কাঠামোগত প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মসংস্থানের চাপ ক্রমবর্ধমান; প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অর্থ হলো উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি—তিনটি ক্ষেত্রেই জোরালো সম্প্রসারণ। কর্মসংস্থান বাতাস থেকে আসে না; এটি আসে বিনিয়োগ থেকে, শিল্পায়ন থেকে, মূলধন সঞ্চালন থেকে। আর এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকে আর্থিক খাত—বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও মুদ্রানীতি।
বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প ও সেবাখাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে, এবং রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প, যা মোট পণ্য রপ্তানির সিংহভাগ জোগান দেয়—এ তথ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত। শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, কার্যকর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্যবস্থাপনা, স্থিতিশীল সুদের হার এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়; এটি আর্থিক পরিবেশ নির্মাণের প্রশ্ন।
মোস্তাকুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ–র সঙ্গে যুক্ত থেকে শিল্প–অর্থায়নের বাস্তব সংকট, রপ্তানি বিল নিষ্পত্তির জটিলতা, এলসি খোলা ও ডলার ব্যবস্থাপনার সমস্যা—এসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন। ফলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তার ধারণা তাত্ত্বিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এতে প্রভাব ফেলেছে। রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এখন কেবল মুদ্রানীতির প্রশ্ন নয়; এটি রপ্তানি প্রতিযোগিতা, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত কৌশলের প্রশ্ন। একজন গভর্নর যদি রপ্তানি খাতের বাস্তব কার্যপ্রণালি, ডলার সংকটের অন্তর্গত কারণ এবং ব্যাংক–শিল্প সম্পর্কের টানাপোড়েন বুঝতে পারেন, তাহলে নীতিনির্ধারণে সেই বোঝাপড়া প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুদের হার, বিনিময় হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনা—এসব সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে নয়, বাজারের বাস্তবতায় পরীক্ষিত হয়।
মোস্তাকুর রহমান বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন—যেমন রিয়েল এস্টেট ও আবাসন খাত, ভ্রমণ খাত এবং চেম্বারভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা তাকে আর্থিক খাত ও বাস্তব খাতের মধ্যকার দূরত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ ছিল—কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি। এই দূরত্ব কখনো কখনো নীতির প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। যদি নেতৃত্ব এমন কারও হাতে যায়, যিনি দুই জগতের ভাষা বোঝেন—নিয়ন্ত্রকের ভাষা ও উদ্যোক্তার ভাষা—তাহলে সমন্বয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। শিল্পবান্ধব মুদ্রানীতি মানে শিথিলতা নয়; এর অর্থ হলো প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্থিতির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ব্যাংক তদারকি। মুদ্রাস্ফীতি যখন উচ্চমাত্রায় থাকে, তখন সুদের হার কঠোর করা হয়; কিন্তু অতিরিক্ত কঠোরতা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আবার অতিরিক্ত উদারতা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা।
একজন সার্টিফায়েড কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের পেশাগত প্রশিক্ষণ তাকে অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যালেন্স শিট বিশ্লেষণ ও অডিট কাঠামোর বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর সম্পদ–দায় কাঠামো, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এবং প্রভিশনিং নীতির যথার্থতা যাচাইয়ে এই দক্ষতা কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বারবার আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব স্বচ্ছতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হিসাবের নির্ভুলতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। গভর্নরের নেতৃত্বে যদি অভ্যন্তরীণ অডিট কাঠামো শক্তিশালী হয় এবং তথ্যপ্রকাশে স্বচ্ছতা বাড়ে, তাহলে বাজার–আস্থা পুনর্গঠিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে—এ প্রেক্ষাপটে একজন কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রক মানসিকতার গভর্নর প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশ খুব শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির ঘোষণায় নির্ধারিত সূচক পূরণ করে বাংলাদেশ উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী উত্তরণ কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি–ভিত্তিক শুল্কমুক্ত সুবিধা ধীরে ধীরে পুনর্বিবেচনার মুখে পড়বে। রপ্তানি প্রতিযোগিতা তখন আর কেবল শ্রমমূল্যনির্ভর থাকবে না; দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও আর্থিক সহনশীলতা হবে মূল চাবিকাঠি। এই রূপান্তরের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ও রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব যদি রপ্তানি খাতের বাস্তবতা বোঝে এবং ডলার ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে উত্তরণ–পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে।
আমার নিজস্ব আগ্রহের জায়গা বিনিয়োগ ব্যাংকিং—মূলধন বাজার, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও শিল্পায়নের সংযোগ। বাংলাদেশে শিল্পায়নের জন্য ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের বিকাশ প্রয়োজন—এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বহুবার জোর দেওয়া হয়েছে। একজন গভর্নর যদি ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের সমন্বিত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেন, তাহলে শিল্পায়নের অর্থায়ন কাঠামো বহুমুখী হতে পারে। এতে ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত হবে।
এখন প্রশ্ন—এটি কি নিছক ব্যক্তিগত আস্থার কথা? না। এটি একটি অর্থনৈতিক যুক্তির কথা। বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা চাপে থাকা রিজার্ভ এবং প্রবৃদ্ধি–সংকোচনের ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এ তথ্য সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেই প্রতিফলিত। এই প্রেক্ষাপটে কেবল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়, বাস্তব অর্থায়ন–প্রবাহ, শিল্পের নগদ প্রবাহ, রপ্তানি বিলম্ব ও ব্যাংক–শিল্প সম্পর্কের অন্তর্গত সমস্যাগুলো বোঝে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন। থিওরি প্রয়োজন, কিন্তু থিওরিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে এমন প্র্যাকটিক্যাল বোধ আরও জরুরি।
আমি বিশ্বাস করি, মোস্তাকুর রহমানের পেশাগত অভিজ্ঞতা—শিল্প, রপ্তানি, ব্যাংকিং সংলাপ ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ—এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক। তিনি ভালো করবেন—এটি কোনো অন্ধ সমর্থন নয়; এটি একটি প্রত্যাশা, যা তার পেশাগত পটভূমির ওপর দাঁড়িয়ে। চূড়ান্ত বিচার অবশ্যই তার নীতি, স্বচ্ছতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে হবে। কিন্তু সম্ভাবনাকে শুরুতেই অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অযৌক্তিক। রাষ্ট্রের অর্থনীতি যখন চ্যালেঞ্জে, তখন আমাদের প্রয়োজন কার্যকর নেতৃত্ব। আমি লিখতে চাইনি, তবুও লিখলাম—কারণ এই মুহূর্তে বাস্তব অর্থনীতি বোঝে এমন মানুষের প্রয়োজন, এবং আমার বিশ্বাস, তিনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সক্ষমতা রাখেন।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন :