হিমালয়ের শিক্ষা ও আমাদের পাহাড়: পর্যটনের নতুন দিগন্তের সন্ধানে
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
নেপালের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা বরফে ঢাকা হিমালয়ের চূড়া, পশুপতিনাথ মন্দিরের শান্ত পরিবেশ আর কাঠমুন্ডুর সরু গলিগুলোতে ঝোলানো রঙিন পতাকার সারি। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, নেপাল কেবল পাহাড়ের দেশ নয়, নেপাল হলো এক অদ্ভুত জাদুর দেশ যেখানে মানুষ তাদের অভাবকে সম্পদে রূপান্তর করতে শিখেছে। নেপালের পর্যটন দর্শনটা খুব সোজাসাপ্টা তারা প্রকৃতিকে বিক্রি করে না, বরং প্রকৃতি আর মানুষের ভেতরের যে আত্মিক যোগাযোগ, সেটাকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে। সেখানে আপনি যখন কোনো পাহাড়ি ট্রেইলে হাঁটবেন, দেখবেন স্থানীয় মানুষগুলো ‘নমস্তে’ বলে এমন এক হাসি দিচ্ছে, যেন আপনি তাদের বহু বছরের পুরনো বন্ধু। এই যে আতিথেয়তা আর প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকা, এটাই নেপালের পর্যটনের মূল ভিত্তি। তারা বুঝেছে যে, পর্যটকদের কেবল বিলাসবহুল হোটেল দিলেই হয় না, তাদের দিতে হয় একটা গল্প, একটা অভিজ্ঞতা যা তারা সারা জীবন মনে রাখবে। নেপালের এই পর্যটন বিপ্লব কিন্তু একদিনে আসেনি। তারা তাদের প্রতিটি পাহাড়কে এক একটা গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। আপনি এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে যান কিংবা অন্নপূর্ণা সার্কিটে, সর্বত্রই দেখবেন স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা। তারা বড় বড় দালান বানিয়ে পাহাড়ের বুক চিরতে যায়নি, বরং পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট ‘টি-হাউস’ বা হোম-স্টে বানিয়ে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। এতে পাহাড়ের পরিবেশ যেমন রক্ষা পেয়েছে, তেমনি পর্যটকরাও পাহাড়ের আসল স্বাদ পেয়েছে।
নেপাল কিভাবে পর্যটনে এত উন্নতি করল, সেই রহস্যটা আমাদের মতো দেশের জন্য এক বড় পাঠশালা হতে পারে। নেপাল সরকার পর্যটনকে কেবল একটা খাত হিসেবে দেখেনি, তারা এটাকে তাদের জাতীয় পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা ভিসা প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পর্যটকদের নিরাপত্তা পর্যন্ত সবকিছুকে এত সহজ করে দিয়েছে যে, একজন বিদেশি পর্যটক সেখানে গিয়ে নিজেকে খুব নিরাপদ আর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাদের ব্র্যান্ডিংটা ছিল নিখুঁত। তারা প্রচার করেছে নেপাল হলো এমন এক জায়গা যেখানে ‘পৃথিবীর ছাদ’ ছোঁয়া যায়। কিন্তু আসল কথা হলো, তারা তাদের লোকজ সংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতাকে পর্যটনের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছে যে, মানুষ সেখানে কেবল দৃশ্য দেখতে যায় না, মনের শান্তি খুঁজতেও যায়। নেপালের ট্র্যাকিং রুটগুলো পৃথিবীর সেরা হওয়ার প্রধান কারণ হলো সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ। তারা পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আর প্রতিটি গাছকে সম্মান করতে জানে। নেপালের সাফল্যের পেছনে আরেকটা বড় হাত হলো তাদের ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম’ বা স্থানীয় মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ। পর্যটকের দেওয়া টাকার একটা বড় অংশ সরাসরি ওই পাহাড়ের মানুষের পকেটে যায়, ফলে তারা নিজেরাই পর্যটন এলাকাগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব নেয়। আমাদের এখানে যেমন দেখা যায় ট্যুরিস্টদের পকেট কাটার একটা প্রবণতা, নেপালে সেটা একেবারেই উল্টো। তারা বিশ্বাস করে অতিথি হলো দেবতার মতো। এই মানসিকতাই তাদের আজ বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এখন যদি আমরা নেপালের সেই অভিজ্ঞতার আয়নায় আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেখি, তবে কি খুব বেশি তফাত চোখে পড়ে? খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি আর বান্দরবানের এই পাহাড়গুলো কি কোনো অংশে নেপালের পাহাড়ের চেয়ে কম সুন্দর? আমার তো মনে হয় আমাদের এই ঘন সবুজ পাহাড়গুলো আরও বেশি রহস্যময় আর মায়াবী। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখনো কেবল এক টুকরো ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে দেখছি, এটাকে একটা আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছি না। নেপালের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামকে যদি আমরা দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন হাব করতে চাই, তবে আমাদের চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নেপালে যেমন মানুষ ট্র্যাকিং করতে যায়, আমাদের এখানেও বগালেক, কেওক্রাডং কিংবা সাজেকের পাহাড়ি পথগুলো হতে পারে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের স্বর্গ। কিন্তু আমরা সেখানে কী করছি? আমরা পাহাড় কেটে বড় বড় রিসোর্ট বানাচ্ছি, পাহাড়ের নির্জনতাকে নষ্ট করে জেনারেটরের আওয়াজ আর প্লাস্টিকের স্তূপ জমা করছি। নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য হলো তার আদিমতায়। আমাদের উচিৎ হবে এই পাহাড়গুলোকে তার নিজের রূপে থাকতে দেওয়া। বড় বড় হোটেল না করে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীদের ঘরগুলোকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। একজন পর্যটক যখন চাকমা বা মারমা পল্লিতে তাদের সাথে খাবে, তাদের মাচাং ঘরে ঘুমাবে, তখন সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবে। এটাই হবে আমাদের আসল পর্যটন।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন কেন্দ্র করতে হলে আমাদের প্রথম কাজ হতে হবে যাতায়াত ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নেপালে ছোট ছোট বিমানে করে দুর্গম পাহাড়ে পর্যটক নিয়ে যাওয়া হয়, যা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আমরাও কিন্তু আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটন বান্ধব ছোট বিমান বা হেলিকপ্টার সার্ভিসের কথা ভাবতে পারি। তাছাড়া সড়কপথের উন্নয়ন তো আবশ্যক। তবে সেই উন্নয়ন যেন পাহাড়ের বাস্তুসংস্থান নষ্ট না করে। নেপালের মতো আমাদেরও ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ’ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী এবং বন্ধুসুলভ করতে হবে। পর্যটকরা যেন পাহাড়ে গিয়ে নিজেদের কোনো ভিনগ্রহের মানুষ মনে না করেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের এই পাহাড়ের যে এগারোটি নৃগোষ্ঠী আছে, তাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। তাদের পোশাক, খাবার আর উৎসবগুলো হতে পারে কালচারাল ট্যুরিজমের এক বিশাল উৎস। আমরা যদি নেপালের লুম্বিনীর মতো করে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বিহারগুলোকে কেন্দ্র করে ‘রিলিজিয়াস ট্যুরিজম’ বা ধর্মীয় পর্যটন গড়ে তুলতে পারি, তাহলে থাইল্যান্ড, চীন কিংবা জাপানের হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসবে। আমাদের কেবল দরকার একটা দূরদর্শী পরিকল্পনা।
নেপালের পর্যটন উন্নতির পেছনে আরেকটা বড় শক্তি হলো তাদের ‘গাইড’ সংস্কৃতি। নেপালের গাইডরা কেবল পথ দেখায় না, তারা পর্যটকের বন্ধু হয়ে ওঠে, পাহাড়ের গল্প শোনায়। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত তরুণদের যদি প্রফেশনাল গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে তারা কেবল নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করবে না, বরং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত হিসেবে কাজ করবে। একটা দেশ তখনই পর্যটনে সফল হয় যখন সেই দেশের সাধারণ মানুষ সেই পর্যটনকে নিজের মনে করে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিশাল সম্ভাবনা আছে, তা যদি আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সংযুক্ত করতে পারি, তবে দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। যেমন ধরুন, ভারতের সেভেন সিস্টারস বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে যদি আমাদের পাহাড়ি জেলাগুলোর সরাসরি সংযোগ বা বিশেষ পর্যটন করিডোর থাকত, তবে এই পুরো অঞ্চলটা একটা বিশাল টুরিস্ট জোন হয়ে উঠত। আমরা নেপাল, ভুটান আর ভারতের পর্যটনকে এক সুতোয় গেঁথে একটা ‘মাউন্টেন সার্কিট’ তৈরি করতে পারতাম। এতে কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই লাভবান হতো।
কিন্তু পাহাড়কে হাব বানাতে গেলে আমাদের কিছু রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কি পর্যটন বলতে কেবল হইহুল্লোড় বুঝি? সাজেক ভ্যালির অবস্থা আজ অনেকটা ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকার মতো হয়ে যাচ্ছে। শত শত রিসোর্ট পাহাড়ের ভারসাম্য নষ্ট করছে। নেপালে কিন্তু এমন যত্রতত্র দালান বানানোর সুযোগ নেই। সেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পর্যটন চলে। আমাদেরও উচিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটা ‘মাস্টার প্ল্যান’ তৈরি করা। কোথায় পর্যটক যাবে, কোথায় যাবে না, পাহাড়ের কতটা অংশ সংরক্ষিত থাকবে এসব বিষয়ে কঠোর নিয়ম থাকতে হবে। পর্যটন মানে কেবল টাকা আয় করা নয়, পর্যটন মানে হলো সম্পদকে আগলে রাখা। নেপাল তাদের পাহাড়কে রক্ষা করেই আজ ধনী হয়েছে। আমরা যদি পাহাড় কেটে সব সাফ করে ফেলি, তবে পর্যটকরা আসবে কী দেখতে? কংক্রিটের জঙ্গল দেখার জন্য কেউ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসবে না। তারা আসবে মেঘের ছোঁয়া নিতে, তারা আসবে পাহাড়ের ওই স্থানীয় মানুষগুলোর জীবনের সহজ পাঠ নিতে
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনকে বিশ্বমানের করতে হলে আমাদের ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ে জোর দিতে হবে। নেপাল যেভাবে তাদের ‘ভিজিট নেপাল’ ক্যাম্পেইন করে সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়, আমরা কি আমাদের পাহাড় নিয়ে তেমন কিছু করতে পেরেছি? আমাদের দরকার এমন সব ভিডিও আর কন্টেন্ট যা দেখলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের মনে হবে একবার হলেও এই সবুজ পাহাড়ে যাওয়া উচিত। আমাদের প্রতিটি ঝরনা, প্রতিটি হ্রদ আর প্রতিটি পাহাড়ের চূড়া নিয়ে আলাদা আলাদা গল্প তৈরি করতে হবে। পর্যটন এখন কেবল দেখার বিষয় নয়, এটা শোনার আর অনুভব করার বিষয়। আমাদের নাফাখুম কিংবা অমিয়াখুমের মতো অপূর্ব জলপ্রপাতগুলোর গল্প যদি আমরা বিশ্বের ট্রাভেল ম্যাগাজিনগুলোতে পৌঁছে দিতে পারতাম, তবে আজ আমাদের বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতো।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের দেশি পর্যটকদের আচরণ। নেপালে গেলেই দেখবেন পর্যটকরা কত সতর্ক, তারা একটা চকোলেটের খোসাও রাস্তায় ফেলে না। অথচ আমরা আমাদের পাহাড়ে গিয়ে প্লাস্টিকের বন্যা বইয়ে দিই। পাহাড়কে দক্ষিণ এশিয়ার হাব বানাতে হলে আমাদের সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন বা ইকোট্যুরিজমই হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ। পাহাড়ি এলাকায় প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি। পর্যটন শিল্প যখন টেকসই হবে, তখনই বিদেশি বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখানে আগ্রহ দেখাবে। আমরা যদি নেপালের মতো ছোট ছোট ক্যাফে, লাইব্রেরি আর কালচারাল সেন্টার পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে তুলতে পারি, তবে পর্যটকরা সেখানে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেবে। পর্যটন কেবল আসা আর যাওয়ার বিষয় নয়, পর্যটন হলো থেকে যাওয়ার বিষয়। মানুষ যত বেশি সময় একটা জায়গায় থাকবে, সেই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নতি তত ত্বরান্বিত হবে।
পাহাড়কে ভালোবাসা আর পাহাড়কে মর্যাদা দেওয়া শিখলে পাহাড় কোনোদিন কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের এই জনপদের এক অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদকে অবহেলা না করে যদি আমরা নেপালের মতো আন্তরিকতা আর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করি, তবে খুব শিগগিরই আমরা দেখব বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক আমাদের এই সবুজ পাহাড়ের প্রেমে পড়ছে। আসুন, আমরা পাহাড়কে পাহাড়ের মতো থাকতে দিই এবং সেই সুন্দরের সুবাস ছড়িয়ে দিই বিশ্বময়। পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার এক শান্তির নীড় হিসেবে পরিচিতি পাক এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা। এই মাটির টান আর পাহাড়ের উদারতা যদি আমরা বিশ্বকে দেখাতে পারি, তবে আগামীর পর্যটন বিপ্লব ঘটবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন :